হিংস্র কিন্তু নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মাউন্ট ফুজি
Posted on

mount fuji, rarebangla, rare bangla

মাউন্ট ফুজি শুধু জাপান নয় সারা বিশ্বের বিখ্যাত পর্বতশৃঙ্গ গুলোর মাঝে একটি। জাপানের জাতীয় ঐতিহ্যের এই প্রতীককে ইউনেসকো ২০১৩ সালে জাপানের ১৭ তম বিশ্ব হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করে। জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে মাউন্ট ফুজির অবস্থান । রৌদ্রজ্জ্বল দিন গুলোতে সারা টোকিও শহর থেকে এর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। দূর থেকে মাউন্ট ফুজি দেখতে অনেকটা শঙ্কুসদৃশ আকৃতির। সারাদিনে এর অসংখ্যবার রূপ পরিবর্তন সত্যিই মনোমুগ্ধকর এক সৈান্দর্যের সৃষ্টি করে। এজন্য কখনও এটি শিল্পীর কাছে রঙ্গিল তুলি কখনও বা ভ্রমণপিয়াসুদের কাছে দূর্লভ কিছু জয়ের হাতছানি। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মাউন্ট ফুজি জাপানে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সিনতোজিয়াম ধর্মাবলম্বনকারীদের কাছে ফুজি একটি বিশেষ গুরত্বপূর্ন তীর্থ স্থান। ৩৭৭৬ মিটার উচ্চতার মাউন্ট ফুজি শুধুমাত্র জাপানের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গই নয় এটি আসলে একটি সুপ্ত আগ্নিয়গিরিও বটে।
mount fuji, rarebangla, rare bangla
মাউন্ট ফুজির সেীন্দর্য আপনার কাছে অনেকটাই নির্ভর করবে বছরের কোন সময়টায় আপনি ভ্রমণ করছেন তার উপর। তাইতো শীত ও বর্ষা বাদ দিয়ে বছরের বাকি সময়টাতে ভ্রমণ করা খুবই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে হ্যা, যদি পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান তাহলে খুব সকাল আর সন্ধ্যা এই দুটি সময় আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হবে।

মাউন্ট ফুজির গঠন

বিজ্ঞানীদের ধারণা মতে মাউন্ট ফুজি প্রায় সাত লক্ষ্য বছরের পুরাতন। তিনটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগ স্থলে এই পর্বতমালাটি গঠিত হয়েছে। প্লেট তিনটি হচ্ছে আমুবিয়ান প্লেট, ওহোতোক প্লেট এবং ফিলিপিনো প্লেট। বাস্তবিক অর্থে মাউন্ট ফুজি একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। আগ্নেয়গিরিটি সাত লক্ষ্য বছরের পুরোনো হলেও গত দশ হাজার ধরে এর আকৃতিতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে। সম্প্রতি মাউন্ট ফুজির নিচে আরও একটি বেস পর্বতের সন্ধান পাওয়া গেছে যা প্রায় এক লক্ষ বছরের পুরাতন। এ সময়ের মাউন্ট ফুজিকে বলা হয় সেনকমিটেক ফুজি। পরর্বতীতে এক লক্ষ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ের অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বের হয়ে আসা লাভার আস্তরনের মাধ্যমে আজকের মাউন্ট ফুজি গঠিত হয়।
mount fuji, rarebangla, rare bangla
প্রায় ২৩০০ বছর পূর্বে এক অগ্নিপাতের সময় প্রচন্ড বিস্ফরণের কারনে এর জ্বালামুখের পুবের আংশটি ভেঙে পড়ে এবং সমস্ত লাভা আশীরার সমতল ভূমি ও দক্ষিণের মিথিয়া শহরের দিকে প্রবাহিত হয়ে পুরো অঞ্চলকে ধ্বংস করে দেয়। ৬৮৪ সালে মাউন্ট ফুজির উত্তর-পূর্ব দিকে একটি অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল এবং এ থেকে নির্গত লাভা পার্শ্ববর্তী একটি লেকে প্রাবাহিত হয়ে লেকটিকে দুটি অংশে বিভক্ত করে ফেলে। বর্তমানে লেক দুটি সিকো ও শজিনো নামে পরিচিত।
১৭০৭ সালে মাউন্ট ফুজি থেকে সর্বশেষ লাভা উদগীরণ সংঘটিত হয়। এর কিছু দিন আগে জাপানে একাটি বড় আকারের ভূমিকম্পন হয় যা হৈয়ের ভূমিকম্পন নামে পরিচিত। এর ঠিক ৪৯ দিন পরে মাউন্ট ফুজি থেকে এই অগ্ন্যুৎপাতের শুরু হয়। এখন পর্যন্ত রেকর্ডকৃত অগ্ন্যুৎপাতের মধ্যে ১৭০৭ সালের অগ্ন্যুৎপাত ছিল সবচেয়ে প্রলয়ংকারী। এসময় নির্গত লাভা প্রায় ৬০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলে এবং নির্গত ছাই সুদূর ১০০ কিলোমিটার দূরে আবস্থিত টোকিও শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

পর্বতারোহন

mount fuji, rarebangla, rare bangla
মাউন্ট ফুজিতে আরোহনের সময় এমন অনেক নৈসর্গিক দৃশ্য চোখে পড়বে

সৌন্দর্যের ভরপুর এই অপরূপ পর্বতশৃঙ্গ পর্বত আরোহীদের কাছে এতটাই আর্কষণীয় যে প্রত্যেক বছর প্রায় তিন লক্ষ লোক এই পর্বতশৃঙ্গে আহরণ করে। আপনিও যদি এই আহরণে অংশগ্রহন করতে চান তাহলে সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হবে জুলাই থেকে আগষ্ট। এই সময়টাই অফিসিয়াল ক্লাইম্বিং ঋতু। বছরের এ সময় মাউন্ট ফুজি অনেকটাই তুষারমুক্ত থাকে এবং আবহাওয়াও আপেক্ষাকৃত হালকা থাকে। বছরের বাকি সময়টা পবর্তে আরোহন করাটা খুবই বিপদজনক। এসময় তাপমাত্রা -৪০ ডিগ্রিরও নিচে নেমে য়ায এবং বাতাসের বেগ এত বেশি থাকে যা একজন আরোহিকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে।
mount fuji, rarebangla, rare bangla
অন্য দিকে আপনি যদি অফিসিয়াল ক্লাইম্বিং ঋৃতুতে আরোহন করেন তাহলে আপনাকে বিশেষ কোন অভিজ্ঞতার প্রয়োজন দরকার হবে না। তবে ভালো ফিটনেস যদি না থাকে তাহলে রিস্কটা না নিলেই মনে হয় ভালো হয়। আপনাকে অবশ্যই শীতের কাপড় সঙ্গে নিতে হবে কারণ আপনি যতো উপরের দিকে আগ্রসর হবেন শীতের তীব্রতাও বাড়তে থাকবে। পাথুরে রাস্তা গুলো দিয়ে হাঁটার জন্য হাইকিং বুটজুতা আবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। বেশির ভাগ মানুষই পর্বতের চুড়া থেকে সূর্যোদয় দেখতে পছন্দ করে। সূর্যোদয়ের মনোরম সৌর্ন্দয্য সত্যই অবাক করার মতো। ক্লাইম্বিং ঋতুতে সূর্যোদয় সাধারনত হয়ে থাকে ভোর ৪.২০ থেকে ৪.৫০ এর মধ্যে। এসময়ের মধ্যেই সবাইকে চুড়ায় পৌঁছতে হয়। তাই বেশির ভাগ আরোহি অনেক রাত থাকতেই তাদের যাত্রা শুরু করে থাকে। বাসÍবিক অর্থে পর্বতের অধিকাংশ পথটাই আপনি ড্রাইভ করে আতিক্রম করতে পারবেন। পাহাড়ের বাকি অর্ধেকটা আপনাকে পায়ে হেঁটে যাত্রা করতে হবে। এখানে আপনি চারটি রাস্তা দেখতে পাবেন, প্রত্যেকটাই একটি ভিন্ন প্রান্তের দিকে আগ্রসর হয়। আরোহিরা তাদের ফিটনেসের উপর নির্ভর করে রাস্তাগুলো নির্বাচন করে থাকেন। রাস্তাগুলো যথেষ্ট আলোকিত রাখা হয় যাতে অন্ধকারে পর্বতারোহীদের চলতে অসুবিধা না হয়।
mount fuji, rarebangla, rare bangla
যাত্রাপথে যদি কেউ ক্লান্ত হয়ে যায় তাহলে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য অসংখ্য তাবু সম্বলিত ঘর দেখতে পাবেন। কোনো কোনো স্টপেজে আস্ত ইট পাথর দ্বারা নির্মিত হোটেলও দেখতে পাবেন। এগুলোতে অর্থের বিনিময়ে যতক্ষন খুশি বিশ্রাম নেওয়া য়ায। আসলে রাতের এই সময়টা দিনের আলোর মতোই ব্যাস্ত থাকে এইখানে। পর্বতের বেশ কয়েকটি স্টপেজে খাবার ও পানীয়র অনেকগুলো দোকান দেখতে পাবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে চার থেকে দশ ঘন্টায় চুড়ায় পৌঁছাতে পারা সম্ভব।

আওকিগাহারা বনভূমি

mount fuji, rarebangla, rare bangla
আওকিগাহারা বনভূমি, যেখানে ভুত প্রেত দানবদের বসবাস

মাউন্ট ফুজির অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে মৃত্যুপুরীর হাতছানি। মাউন্ট ফুজির পাদদেশেই বিস্তীর্ণ বনভূমি আওকিগাহারা। এ বন জাপানের অন্যতম সুইসাইড স্পট হিসাবে কুখ্যাত। কিছুদিন পরপরই এখান থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষের লাশ পাওয়া যায়। তাই এখানে গেলে আপনি আত্মহত্যার প্রতি অনুৎসাহিত মূলক অনেক সাইনবোর্ড দেখতে পাবেন। কিন্তু কেনই বা এই বনে মানুষ এত বেশি আত্মহত্যা করে! এ বন সম্পর্ক জনমনে অনেক গুজব ছড়িয়ে আছে। জাপানের বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করেন যে এই বনে ভূত, দানব, প্রেতাত্মাদের বসবাস আছে এবং তারাই নাকি জীবনের প্রতি আনাগ্রহী ব্যক্তিদের এখানে টেনে আনে। যদিও আধুনিক যুগে এসব অদ্ভুতুড়ে বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই তবে বনের ভেতরের থমথমে পরিবেশ যে কারোরই গায়ের লোম দাড় করিয়ে দিবে। গ্রীষ্মকালেও আওকিগাহারা বনভূমিতে এমন এমন গুহা পাওয়া যায় মধ্যে বরফ পাওয়া য়ায।

দূষণ সমস্যা এবং ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ
mount fuji, rarebangla, rare bangla
১৯৬০-এর দশকে, জাপান এই পর্বতমালার উপরে একটি হাইওয়ে নির্মাণ করে, যা পর্যটকদের এবং তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। প্রতি বছর এই পর্যটকদের এবং তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ এবং এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। এর ফলে একটি গুরুতর দূষণের সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৯০ এর দশকের প্রথম দিকে জাপানের স্থানীয় নাগরিক ও পরিবেশগত দলগুলো মাউন্ট ফুজিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করার জন্য জাতিসংঘের শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন (ইউনেস্কো) প্রতি আবেদন করেন। ১৯৯৫ সালে একটি দর্শনের পর, ইউনেস্কো প্রতিনিধিরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও মাউন্ট ফুজি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্টের যোগ্য, তবে জাপানকে প্রথমে দূষণ সমস্যা সমাধান করতে হবে এবং একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এরপরে জাপানি নাগরিক ও সংগঠন একটি ক্রমবর্ধমান সফল পরিচ্ছন্নতা প্রচারণা চালু করে এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ২০০৭ সালে মাউন্ট ফুজিকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা জন্য আবারও ইউনেস্কোকে আবেদন জমা দেওয়া হয় । আবশেষে ২০১৩ সালে ইউনেস্কো মাউন্ট ফুজিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করে যা জাপানের ইতিহাসে শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে।

ভবিষ্যত অগ্ন্যুৎপাত সম্পর্কিত তথ্যাবলী
mount fuji, rarebangla, rare bangla
পুনরায় কবে মাউন্ট ফুজি থেকে আবারও অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হবে বিশেষজ্ঞরা তা এখন পর্যন্ত সঠিক ভাবে ভবিষৎবাণী করতে পারেননি। তবে ২০১১ সালে ভূমিকম্প ও সুনামির পরে উদ্বেগ অনেকটাই বৃদ্ধি পায় এবং রিডিংগুলি নির্দেশ করে যে মাউন্ট ফুজির ম্যাগমা চেম্বারের চাপ এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও একটি বড় ধরণের অগ্ন্যুৎপাত হওয়ার সম্ভবনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২০০২ সালে প্রকাশিত একটি সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন অগ্ন্যুৎপাত শত শত বর্গমাইলের উপরে লাভা, ধ্বংসাবশেষ এবং ছাই ছড়িয়ে দিতে পারে।

Comments

comments